আজ শনিবার, ৬ জুন ২০২০ ইং | ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

মসজিদের মুয়াজ্জিন থেকে বাংলা সিনেমার ভিলেন!

মাতৃভূমি ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিতঃ ৬ এপ্রিল ২০১৯ সময়ঃ দুপুর ২ঃ৩৯
মসজিদের মুয়াজ্জিন থেকে বাংলা সিনেমার ভিলেন!

বাংলাদেশের সিনেমাতে খল নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করে যে কজন গুণী অভিনেতা জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন তাদের মাঝে অন্যতম একজন ডন।জনপ্রিয়তা অর্জনের পাশাপাশি তিনি সমৃদ্ধি করেছেন এ দেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে। অথচ ছোটকালে আশরাফুল হক নামে পরিচিত এই অভিনেতা বেড়ে উঠেছেন একটি ধর্মভীরু মুসলিম পরিবারে। এমনকি অভিনয় জীবন শুরু করার আগে আযান দিতেন গ্রামের মসজিদে। আমাদের আজকের আয়োজনে জানবো একজন মুয়াজ্জিন থেকে খারাপ চরিত্রের অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই অভিনেতার জীবনের গল্প। সেই সাথে তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের নানান অজানা তথ্য জানতে খবরটি পড়তে থাকুন শেষ পর্যন্ত। 

বাংলা চলচ্চিত্রে সেরা খলনায়কদের মধ্যে ডন অন্যতম একজন। তিনি তার সৃজনশীল অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্র অঙ্গনে নিজের নামটা পাকাপোক্ত করতে সক্ষম হোন। ৬০০ এরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করা এই অভিনেতার জন্ম ১৯৭১ সালের ৭ ই আগস্ট বগুড়ার একটি কাজী বাড়িতে। বাবা আলহাজ্ব মোহাম্মদ নজরুল হক প্রয়াত হলেও মা মোসাম্মৎ মোয়াজ্জেমা হক বসবাস করছেন আমেরিকায়। দশ ভাই বোনের সংসার তাদের। সবার ছোট ছেলেই ডন।তার পুরো নাম আশরাফুল হক ডন। খুব ছোট কাল থেকেই তিনি বড় স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসতেন। তিনি স্বপ্ন দেখতেন এমন কিছু করে দেখাতে যার ফলে পুরো দেশবাসী তাকে চেনে। সেই চিন্তা থেকেই তিনি দুটো পথ বেছে নিয়েছিলেন। মিডিয়া অঙ্গনে কাজ করার ইচ্ছার পাশাপাশি স্বপ্ন দেখতেন বড় কোনো আর্মি অফিসার হয়ে দেশের সেবা করতে। তবে সেটা না হলেও তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে মিডিয়াঙ্গনে নিয়মিত কাজ করে ইতিপূর্বেই নিজের নাম তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন পুরো দেশবাসীর নিকট। এর আগে একটা সময় অভিনেতা হওয়ার নেশাটা তার মাঝে খুব বড়ো ভাবে নাড়া দিলে নিজেকে আর চার দেওয়ালের মাঝে আটকে রাখতে পারেন নি। সেই নেশাকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি একসময় চলে আসেন ঢাকা। ঢাকায় আসার পরই পরিচিত হন পরিচালক সোহানূর রহমান সোহানের সঙ্গে। তিনি প্রথম তাকে চলচ্চিত্রে সুযোগ করে দেন। ছবির নাম 'লাভ'। কিন্তু ডনের প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি 'কেয়ামত থেকে কেয়ামত '। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৯২ সালে। তখন থেকেই চলচ্চিত্র তার ধ্যনজ্ঞান হয়ে যায়। সেই সময় সালমান শাহ ও মৌসুমির সাথে অভিনয়ের মাধ্যমে ডন নিজেকে একজন প্রতিভাবান অভিনেতা হিসেবে প্রমাণ করতে সক্ষম হন যার ফলে আর কখনোই পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। এই ছবিতেই অভিনয়ের সুবাদে পরিচিত হন প্রয়াত সালমান শাহের সাথে। শুরু হয় তাদের বন্ধুত্ব। চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে ডন সালমান শাহের সবচেয়ে কাছের বন্ধুটিই ছিলেন। সালমান শাহের রহস্যজনক মৃত্যুর পর থেকেই তিনি নিজেকে বড্ড নিঃসঙ্গ ভাবতে শুরু করেন।যেকোনো আলোচনায় তুলে আনেন তার প্রিয় বন্ধুটির কথা। এমনও অনেক হয়েছে, তিনি তার বন্ধুর কথা স্মরণ করতেই চোখের জল ছেড়ে দিয়েছেন। সেই সাথেও তিনি বারবার এটা জানান যে সালমান শাহের অকাল মৃত্যু এ দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। চলচ্চিত্র অঙ্গনে পা ফেলার পরে থেকেই নিয়মিত অভিনয় করে যাচ্ছেন তিনি। এ পর্যন্ত তিনি ৬০০ টিরও বেশি সিনেমাতে অভিনয় করেছেন। তার মাঝে এ জীবন তোমার

আমার, বিক্ষোভ, ভালোবাসার মূল্য কত, ভালোবাসা কারে কয়, তোমাকে চাই, ফুলের মত বউ, জীবন সংসার, বিয়ের ফুল, মিলন হবে কত দিনে ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে সালমান শাহ অভিনীত ২৭ টি ছবির মধ্যে ২৪ টিতেই খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করেন ডন। সালমানের সাথে ডনের অভিনীত প্রায় সবগুলো সিনেমায় ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তার মুখ দেখে। একজন ভিলেন হিসেবে সিনেমাতে ডন ছিলেন ভয়ংকর একজন মানুষ। তার চেহারা দেখেও একবার বিয়ে বাড়িতে এক বাচ্চা বারবার বেহুশ হয়ে যাচ্ছিলো। যার কারণে তিনি বাজে পরিস্থিতির স্বীকার হন। ডন গান শোনার পাশাপাশি গান গাইতেও বড্ড ভালোবাসতেন। বছর দুয়েক আগে একবার এক্সিডেন্ট করে ঘরে বসে থাকার সময় তিনি গিটার বাজানো শিখেছেন, গান চর্চা করেছেন। সেই ভালো লাগা ভালোবাসার জায়গা থেকেই গড়ে তুলেছেন ব্যান্ডদল আর্কাইভ। নানান রকমের সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের পাশাপাশি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন গুণী এই অভিনেতা। তবে সব কিছু ছাপিয়ে আশরাফুল হক ডন একজন ভদ্র ও ভালো চরিত্রের অধিকারী। বাড়ির ছোট ছেলে হওয়ায় সবার আদরের পাত্র। জনপ্রিয় এই মানুষটির সুরেলা কন্ঠ ছোটকাল থেকেই বাড়ির সবাইকে মুগ্ধ করতো।তাই বাড়ির সবাই তার কন্ঠে ফজরের আযান শুনতে বড্ড ভালোবাসতেন। ডন নিজেও বিষয়টি বেশ উপভোগ করতেন। তিনি অনেক আগ্রহ নিয়েই ছোটকালে প্রতিদিন আযান দিতেন। সেই আযানের সুরেই সকলের ঘুম ভাঙতো। শুরু হতো আরো একটি নতুন দিন। টিভির পর্দায় আমরা যে মানুষটিকে দেখি ভয়ংকর, বিপদজনক ও খারাপ চরিত্রে বাস্তব জীবনে সেই মানুষটি খুবই নরম ও সহজ সরল চরিত্রের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বললেও ভুল হবে না। তবে আযান দেওয়া থেকে টিভির পর্দার একজন খারাপ মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়তোবা অনেকের কাছে খারাপ লাগতে পারে।

Design & Developed by ProjanmoIT