আজ বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২০ ইং | ১৬ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ভয়ের বিজ্ঞান

আরিফ আজাদ
প্রকাশিতঃ ৩০ এপ্রিল ২০২০ সময়ঃ দুপুর ১ঃ০০
ভয়ের বিজ্ঞান

একটা গল্প প্রচলিত আছে। গল্পটা এমন, কোন এক কয়েদিকে মৃত্যুদন্ডের আগে জানানো হলো যে, তাকে সাপের কামড় খাইয়ে হত্যা করা হবে। এটা জানিয়ে দিয়ে কয়েদির চোখ বেঁধে ফেলা হলো এবং সে অপেক্ষা করতে লাগলো কবে তাকে সাপের কামড়ে মেরে ফেলা হবে।

তাকে কিন্তু সাপের কামড় খাইয়ে হত্যা করা হয়নি। একটা সাধারণ সূঁচালো সুঁই কেবল ফুটানো হয়েছিলো তার গায়ে। পরক্ষণে দেখা গেলো, ওই কয়েদি ঠিক ঠিক আর্তনাদ করতে করতে মারা গেছে।

তাকে সাপের কামড়ে হত্যা করা হয়নি, কেবল সাধারণ সুঁচ তার গায়ে ফুটানো হয়েছে, এবং এতেই লোকটা মৃত্যুবরণ করেছে। কারণ কি? কারণটা সাইকোলজি।

গল্পটাও সাইকোলোজির। বিজ্ঞান বলে, আমরা যখন ভয় পাই, কিংবা আতঙ্কগ্রস্ত হই, তখন আমাদের মস্তিষ্কের একটা অংশ দ্রুত সক্রিয় হয়ে উঠে। এমন সময়, মস্তিষ্কের ওই অংশ আমাদের শরীরের অন্য বিভিন্ন অংশে সংকেত পাঠাতে থাকে এবং কোষগুলোতে অক্সিজেন সরবরাহ পূর্বের তুলনায় বেড়ে যায়। মস্তিষ্কের ওই অংশ থেকে তখন একধরণের প্রচুর হরমোন নিঃসরণ হতে থাকে। এ সময় আমাদের রক্তচাপ এবং হৃদপিন্ডের কম্পন বেড়ে যায়।

মস্তিষ্কের ওই বিশেষ সংকেত পেয়ে, এমন কিছু কোষ তখন সক্রিয় হয়ে উঠে, যা আমাদের আতঙ্কটাকে অনেকখানি বাস্তব করে দেয়। তখন দেখা যায়, আমরা ঠিক যেটাকে ভয় পাচ্ছি বা আতঙ্কগ্রস্ত হচ্ছি, ঠিক ওই ব্যাপারটাই আমাদের সাথে ঘটতে থাকে, ভিন্নভাবে। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা সহজে বোঝা যাবে।

ধরুন আপনার কোন কলিগ হঠাৎ করে আপনার সামনে রক্তবমি করতে করতে মারা গেলো। রোগ বালাই ছাড়াই একদম সুস্থ একটা মানুষকে হঠাৎ করে এভাবে রক্তবমি করতে করতে মারা যাওয়ার দৃশ্যটা যদি আপনি সরেজমিনে দেখে থাকেন, তাহলে সেটা আপনার ওপর একটা প্রভাব ফেলতে পারে। আপনার মস্তিষ্ক তখন ওই দৃশ্যটা ধারণ করে ফেলে, এবং মস্তিষ্কের যে অংশটা ভয় তৈরি আর ভয় নিয়ন্ত্রণের কাজে নিয়োজিত, সেটা সক্রিয় হয়ে উঠে। তখন আপনার মাঝে অস্থিরতা কাজ করে, বুক ধড়ফড় করে এবং আপনার প্রেশারও বেড়ে যায়। আপনার মনে হতে পারে, আপনিও হঠাৎ এরকম রক্তবমি করে মারা যেতে পারেন। এবং অবিশ্বাস্যরকম সত্যি কি জানেন? তখন আপনার যদি সামান্য কাশিও হয়, আপনি একেবারে ভড়কে যাবেন এবং দৌঁড়ে বেসিনে গিয়ে থুঁথুঁ ফেলে চেক করে দেখবেন যে, থুঁথুঁর সাথে না জানি আবার রক্ত বের হলো কি না! এগুলো একধরনের ফোবিয়া, এবং এগুলো থেকে বড় বড় রোগ তৈরি হতে পারে শরীরে।

 

এই গল্পটা আমার নিজের। বেশ কয়েকদিন আমি একটা ট্রমার মধ্য দিয়ে গিয়েছি। ঘটনা হলো, করোনা ভাইরাস দুনিয়ায় আসার পর এই সংক্রান্ত দেশি-বিদেশি পত্রিকা, জার্নালগুলোতে চোখ রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম যাতে এটার গতিপ্রকৃতি, হালচাল ভালোভাবে বুঝা যায়। দুনিয়াজুড়ে এটায় কতোজন মৃত্যুবরণ করলো আর কতোজন আক্রান্ত হলো, বাংলাদেশে কতোজন মারা গেলো, কতোজন রোগি পাওয়া গেলো, এখানকার হাসপাতালগুলোর অব্যবস্থাপনা সহ নানান বিষয়াদি দেখতে দেখতে একটা ভয় মনের মধ্যে গেঁথে গিয়েছিলো৷ মনে হচ্ছিলো, আমিও বোধকরি করোনায় আক্রান্ত হবো শীঘ্রই৷

তো, সপ্তাহ কিংবা দশদিন পরে একবার বাইরে যাই আধ ঘণ্টার জন্যে। বাজার-সদাই করে আবার টুপ করে ফিরে আসি৷ মুখে সার্জিক্যাল মাস্ক, হাতে গ্লাভস সহ যাবতীয় সতর্কতা তো থাকেই। বাসায় ফিরেই সোজা শাওয়ারে। গোসল দিয়ে দিই গরমাগরম। কিন্তু তবুও, ভিতর থেকে কেনো যেন ভয়টা ছাড়েনা। তাড়িয়ে বেড়ায়। যেদিন বাইরে বাজার করতে যাই, সেদিন বাসায় ফেরার পর থেকে গা টা গরম গরম লাগে। মনে হয়, এই বুঝি করোনা ভাইরাস সাথে করে নিয়ে এলাম!

এমনও হয়েছে, বাইরে থেকে এসে এমন অবস্থার মুখোমুখি হয়ে আ'য়িশার আম্মুকে দিয়ে গায়ের জ্বরও মাপিয়েছি। দেখা গেলো, টেম্পারেচার আটানব্বই। মানে, খুব স্বাভাবিক। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিলো আমার বুঝি ১০২ ডিগ্রী জ্বর।

কেনো এমনটা হয়েছে? ওই যে, ভয় থেকে মস্তিষ্কের একটা বিশেষ অংশ যখন সক্রিয় হয়ে পড়ে, তখন শরীর সংবেদনশীল হয়ে উঠে এবং যা ভাবছি বা যা নিয়ে ভয় পাচ্ছি, ওই ভয়টাকে মস্তিষ্কের ওই অংশ তখন নকল করে। যেহেতু আমি জানি যে, করোনা ভাইরাস ধরলে প্রথমেই জ্বর হবে, তাই আমার মনে হচ্ছে যে, আমার বোধকরি জ্বর আছে। আবার, এই ভয়টা যদি সত্যি পেয়ে বসে, তাহলে সত্যি সত্যি জ্বর আসবে, গলা ব্যথাও হবে। মানে, করোনার যা যা লক্ষণ, সব-ই দেখা যেতে পারে।

 

এই গল্পটা আমার এক বন্ধুর। সম্প্রতি তিনি একজন ডাক্তারের সাথে দেখা করেছিলেন। এবং উনার সাক্ষাতের পরেরদিন বা তারও পরে, ওই ডাক্তার করোনা ভাইরাসে পজিটিভ হয়। মানে, করোনায় আক্রান্ত। এখন, তিনি যেহেতু খুব সম্প্রতিই ওই ডাক্তারের সাথে মিশেছিলেন, এবং ডাক্তারটা যেহেতু করোনা পজিটিভ, তাই আমার বন্ধুটা ভাবলো যে, তারও এখন করোনা পজিটিভ আসতে পারে। তিনি নিজেকে আইসোলেট করে ফেললেন বাসায়।

 

তার মনে হতে লাগলো, এই বুঝি তার জ্বর আসবে৷ এই বুঝি গলা ব্যথা শুরু হবে। ওই যে, করোনার যা লক্ষণ। এবং, সত্যি সত্যি উনার জ্বর এলো, মাথা ব্যথা এবং গলা ব্যথাও হলো। কিন্তু, করোনার টেস্ট করে দেখা গেলো, উনার রেজাল্ট আসলে নেগেটিভ৷ মানে, উনার করোনা হয় নাই। কিন্তু দেখেন, করোনা না হলেও করোনার সকল সিম্পটমের ভিতর দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে। কেনো? ওই যে, এতোক্ষণ যা বললাম। একটা ভয়, দুঃশ্চিন্তা থেকে যা আমাদের মস্তিষ্ককে ওই ভয়টা বাস্তব করে দিতে প্রণোদনা যোগায়।

 

তিন তিনটে গল্প বলার একটাই সারমর্ম, আর তা হলো- ভয় পাওয়া যাবে না। কোনোভাবেই না। যতো বেশি সম্ভব পজিটিভ থাকতে হবে। দিলখুশ রাখতে হবে। যতো বেশি দুঃশ্চিন্তা, ততো বেশি পেয়ে বসা৷ আর, পেয়ে বসা মানেই একটা মানসিক অস্থিরতার ভিতর দিয়ে যাওয়া যা থেকে করোনা না হলেও, অন্য মারাত্মক কিছু হয়ে যেতে পারে।

এখন, চারদিকের এই অবস্থায় কিভাবে আপনি পজিটিভ থাকবেন, তাই তো?

প্রথমত, প্রতিদিন করোনায় কতোজন মারা গেলো, কতোজন আক্রান্ত হলো, সেই সংবাদগুলো দেখা বাদ দিন। এগুলো দেখে আপনার কাজ কি? আপনি তো এই ফিল্ডের এক্সপার্ট নন৷ যারা এক্সপার্ট আছে, যারা এগুলোর ডাটা তৈরি করবে, তারা দেখুক তাদের কাজের জন্য। আপনার দেখে তো লাভ নেই, বরং ক্ষতি আছে। এগুলো দেখতে দেখতে অজান্তেই আপনার ভিতর একটা ভয় তৈরি হবে এবং সেই ভয় আপনাকে প্রচন্ডভাবে ভুগাতে পারে যার উদাহরণ উপরে বলেছি।

দ্বিতীয়ত, প্রোডাক্টিভ কাজকর্ম করা, যেমন- এই সময়ে আপনি পরিবারকে কোয়ালিটি সময় দিতে পারেন। বাচ্চার সাথে খেলাধুলা করা, বাসার কাজে ঘরনীদের সাহায্য করা ইত্যাদি। এখন তো রামাদান, কুরআন পড়া, তাফসির পড়া, সীরাহ পড়ায় মনোযোগ দিতে পারেন বেশি করে। যারা আরবি ভাষা শিখতে চান, অনলাইনে এই সম্পর্কিত ম্যাটেরিয়ালসগুলো দেখতে পারেন। যারা কুরআন পড়তে পারেন না, এই সময়টাই শিখে নিতে পারেন। অনলাইনে অনেক ম্যাটেরিয়ালিস। কেবল সদিচ্ছার প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, আত্মীয়স্বজনের খোঁজ খবর নিন। সাধ্যমত সাহায্য সহযোগিতা করুন তাদের। এই সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারলে মনের অস্থিরতা লাঘব হয়। একটা অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করে।

সর্বশেষ, আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল। আল্লাহকে বেশি বেশি ডাকুন। তাওবা-ইস্তিগফার করুন বেশি বেশি। যতো বেশি তাওবা ইস্তিগফার, ততো বেশি স্বস্তি। তখন আপনার মনে হবে, যাক, মৃত্যু আসার আগে অন্তত কিছু তাওবা-ইস্তিগফার তো করার সুযোগ পেলাম আলহামদুলিল্লাহ। এই ভেবে আপনার মন অস্থিরতা থেকে মুক্ত থাকবে। কিছুটা রিলিফ পাবেন।

 

সুতরাং, ভয়কে পেয়ে বসতে দিবেন না কোনোভাবেই। ভয়কে জয় করুন। বেশি বেশি ইবাদাত করে এই রামাদানকে জীবনের সেরা রামাদান বানিয়ে ফেলুন। করোনা পৃথিবীর কোনোদিকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে, সে খবর আপনার আমার না জানলেও চলবে। সে খবর এই ফিল্ডের এক্সপার্টরাই রাখুক। আমরা আমাদের মাথাটাকে এসব ভয়ের খবর থেকে মুক্ত রাখি। সুস্থ থাকি।

লেখকের বেলা ফুরোবার আগে বই থেকে...... 

Design & Developed by ProjanmoIT