আজ বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২০ ইং | ১৬ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

নেক সুরতে শয়তানের ধোকা

আরিফ আজাদ
প্রকাশিতঃ ২৮ এপ্রিল ২০২০ সময়ঃ সকাল ৯ঃ০০
নেক সুরতে শয়তানের ধোকা

বারসিসার ঘটনাটি জানেন কী?

বারসিসা ছিলেন বনী ইসরাঈলের একজন অত্যন্ত আমলদার আলেম। কথিত আছে, বনী ইসরাঈলরা ঠিক যেই মূহুর্তে পাপের সাগরে হাঁবুডুবু খাচ্ছিলো, ঠিক সেই মূহুর্তে বিশাল একটি জনপদে বারসিসাই ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি যিনি ছিলেন আল্লাহর ইবাদাতে সদা মশগুল। আরো জানা যায়, তিনি তাঁর প্রার্থনা গৃহে একটানা ৭০ বছর যাবৎ ইবাদাত করেছিলেন।

একবার, বনী ইসরাঈলের তিনজন যুবক জিহাদে যাওয়ার জন্য মনস্থির করলো। সেই তিন যুবকের রয়েছে ছোট, যুবতী এক বোন। তারা জিহাদে চলে গেলে পাপ পঙ্কিলময় এই সময়ে তাদের বোনকে কে দেখে রাখবে এই চিন্তায় পড়ে গেলো তিন ভাই। তারা ভাবতে লাগলো কি কিরা যায়।

বনী ইসরাঈলের লোকেরা তখন তাদের বললো,- 'ওহে যুবকেরা! পাপাচারের এই অস্থির সময়ে তোমাদের বোনকে দেখে রাখার মতো, হেফাযতে রাখার মতো বনী ইসরাঈল সমাজে আর কেউ অবশিষ্ট নেই। তবে, তোমরা বারসিসার কাছে তোমাদের বোনকে রেখে যেতে পারো। আমরা তাকে পাপ থেকে মুক্ত, অন্যায় থেকে দূরে, এবং আমাদের মধ্যে সর্বোচ্চ তাকওয়াবান এবং পরহেযগার হিসেবে জানি।'

তিন ভাই এরকম একজন আল্লাহ ওয়ালা লোকের সন্ধান পেয়ে খুব খুশি এবং চিন্তামুক্ত হলো। তারা বারসিসার কাছে এলো এবং উনার কাছে তাদের বোনকে হেফাযতে রাখার আবেদন জানালো। এরকম একজন গায়রে মাহরামের দায়িত্ব নেওয়ার কথা শুনেই ভয়ে কেঁপে উঠলো বারসিসা। বললেন,- 'চুপ করো। আমি পারবো না এই দায়িত্ব নিতে। আল্লাহর ওয়াস্তে চলে যাও তোমরা....'

তিন ভাই মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে চলে যাচ্ছিলো। ঠিক সেই মূহুর্তে শয়তান বারসিসার কাছে এলো(এখানে শয়তান আসা মানে অবচেতন মনে শয়তানের কুমন্ত্রণা), এবং বললো- 'ওহে বারসিসা! কী করলে তুমি? এই সরল, মহৎ ভাইগুলোর আবদার ফিরিয়ে দিলে? তুমি কি মনে করছো তারা জিহাদে গেলে তাদের বোন নিরাপদে থাকবে? কেউ তার সম্ভ্রম হানি করবে না? তাদের বোন কী তোমার কাছেই নিরাপদে থাকতো না?'

বারসিসা ভাবলো,- 'আরে তাই তো! সময়টা তো খুব কঠিন। তাদের বোন তো অন্য কোথাও লাঞ্চিতও হতে পারে। তারচেয়ে আমিই তো তার সম্ভ্রম রক্ষার দায়িত্বটা নিতে পারি...'

বারসিসা তিন ভাইকে ডাক দিলো। বললো,- 'ঠিক আছে। তোমাদের বোনকে আমার কাছে রেখে যেতে পারো। তবে শর্ত, সে আমার সাথে আমার প্রার্থনাগৃহে থাকতে পারবে না। দূরে আমার একটি কুঁড়েঘর আছে। সেখানেই তাকে থাকতে হবে।' ভাইগুলো রাজি হলো। তাদের বোনকে বারসিসার কাছে রেখে গেলো।

বারসিসা রোজ তার প্রার্থনাগৃহের সামনে মেয়েটির জন্য খাবার রেখে দরজা বন্ধ করে দিতো। বারসিসা ভিতরে ঢুকে পড়লে মেয়েটি চুপি চুপি এসে তার খাবার নিয়ে যেতো। এভাবেই চলতে লাগলো.....! একদিন, শয়তান আবার আসলো বারসিসার কাছে। এসে বললো,- 'ওহে বারসিসা! তুমি মেয়েটির জন্য তোমার ঘরের সামনে খাবার রেখে ঢুকে পড়ো। এরপর, মেয়েটি তার ঘর থেকে বের হয়ে তোমার ঘর অবধি এসে সেই খাবার নিয়ে যায়। কিন্তু, তুমি জানো কী, তোমার ঘর অবধি আসার সময়ে মেয়েটাকে কতো পরপুরুষ দেখে? এটা কী ঠিক? তুমি তো চাইলেই মেয়েটার ঘর পর্যন্ত খাবারগুলো দিয়ে আসতে পারো।' বারসিসা ভাবলো,- 'আরে তাই তো! আমার ঘর অবধি আসা পর্যন্ত মেয়েটাকে তো অনেক পরপুরুষই দেখে ফেলে।'

এরপরদিন থেকে বারসিসা নিজের ঘরের সামনে না রেখে, মেয়েটার ঘরের দরজায় খাবার রেখে আসতো। এভাবে কিছুদিন যাওয়ার পর শয়তান আবার এলো। বললো,- 'বারসিসা, ভারি আজব লোক তো তুমি। তার ঘর অবধি যাও, কিন্তু তার সাথে দু-একটা কথা বললেই তো পারো। বেচারি ভাইদের অনুপস্থিতে কতো নিঃসঙ্গ জীবনই না পার করছে...' বারসিসা ভাবলো,- 'ঠিক তো। তার সাথে অল্প আলাপ করতে তো দোষ নেই।' এরপর থেকে বারসিসা ঘরের সামনে খাবার না রেখে, খাবার নিয়ে সোজা ঘরে ঢুকতো এবং মেয়েটার সাথে কিছুক্ষণ আলাপও করতো।

এভাবে, আস্তে আস্তে তাদের খুচরো আলাপগুলো দীর্ঘ আলাপে পরিণত হয়, এবং একপর্যায়ে, বারসিসা মেয়েটার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। বারসিসা মেয়েটার সাথে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। আর মেয়েটা গর্ভবতী হয়ে পড়ে। বারসিসা তার অপরাধ টের পেলো। সে ভাবলো,- 'হায়! আমি কি করলাম। তার ভাইয়েরা এসে এই অবস্থা দেখলে তো আমাকে মেরেই ফেলবে।'

বারসিসা ভাবলো, সে তার ঔরসজাত সন্তানটিকে মেরে পুঁতে ফেলবে। কিন্তু মেয়েটা? মেয়েটা যদি বলে দেয় সব? শয়তান আবার এসে তাকে বুদ্ধি দিলো। বললো,- 'বারসিসা! বাঁচতে চাইলে মেয়েটাকেও মেরে পুঁতে ফেলো।' বারসিসা তাই করলো। মেয়েটাকে এবং তার অবৈধ সন্তানটিকে মেরে সে ঘরের মেঝে খুঁড়ে তাতে পুঁতে রাখলো। আর, উঠোনের একপাশে কবরের মতো উঁচা করে একটা ঢিবি করে রাখলো।

মেয়েটির ভাইয়েরা যখন ফিরে তাদের বোনের খোঁজ নিতে আসলো, বারসিসা জানালো যে, তারা চলে যাবার পরে তাদের বোন এক দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। বারসিসা উঠোনের পাশের ঢিবিটা দেখিয়ে বললো,- 'ওই যে তার কবর...' মেয়েটার ভাইয়েরা বারসিসাকে বিশ্বাস করলো যেহেতু সে পরগেযগার ছিলো। তার কান্নাকাটি করে চলে গেলো।

রাতে, মেয়েটির এক ভাইকে স্বপ্নে শয়তান বললো,- 'শোন, তোমার বোন কোন প্রকার রোগে মারা যায় নি। তোমরা চলে যাবার পরে বারসিসা তোমার বোনের সাথে অপকর্ম করে ফেলে। তোমাদের ক্রোধ থেকে থেকে বাঁচতে সে তোমাদের বোনকে খুন করে ঘরের মেঝেতে পুঁতে রেখেছে। বিশ্বাস না হয় তো গিয়ে দেখো....' সকালে মেয়েটার সেই ভাইটি স্বপ্নের কথা অন্য দু'ভাইকে জানালো। তারা খুব অবাক হলো শুনে। কারণ, ঠিক একই স্বপ্ন অন্য দু'জনও দেখেছে। তারা ধরে নিলো- তাহলে এটা নিছক কোন স্বপ্ন নয়। তারা বারসিসার দেখানো কবরটা খুঁড়লো কিন্তু কিছুই খুঁজে পেলো না তাতে। এরপর, তার ঘরের মেঝে খুঁড়ে দেখে সেখানে তাদের বোনের লাশ। তারা রাগে, ক্রোধে বারসিসাকে টানতে টানতে বিচারকের দরবারে নিয়ে যেতে লাগলো।

এবার বারসিসার মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত। পথিমধ্যে, শয়তান বারসিসার সামনে আবার হাজির হলো। এক বৃদ্ধ লোকের অবয়ব ধরে। বললো,- 'বারসিসা! আমাকে চিনতে পারছো? আমি শয়তান।আমিই তোমাকে কুমন্ত্রণা দিয়ে এসব করিয়েছি। আর, আজ আমিই একমাত্র যে তোমাকে এই শাস্তির হাত থেকে বাঁচাতে পারি...' বারসিসা কান্না করতে করতে বললো,- 'দয়া করে আমাকে বাঁচাও....' শয়তান বললো,- 'বাঁচাতে পারি এক শর্তে...' - 'কি শর্ত?' - 'আমাকে সিজদাহ করো...' প্রাণ বাঁচাবার তাগিদে উঁচুমানের ঈমানওয়ালা বারসিসা শয়তানকে সিজদাহ করে বসলো। এরপর, শয়তান হাসতে হাসতে বললো,- 'আজ আমি সফল বারসিসা, আমি সফল। তুমি মরো গিয়ে এবার.....' বলতে বলতে শয়তান অদৃশ্য হয়ে গেলো।

বারসিসাও ঈমান হারা হলো এবং একটু পরে তার মৃত্যুদন্ড হলো। পাঠক, এখান থেকে যা শেখার তা হলো, শয়তান কীভাবে নেক সুরতে ধোঁকা দেয়, সেটা। খেয়াল করে দেখুন, বারসিসাকে দেওয়া শয়তানের প্রত্যেকটা উপদেশ কিন্তু আপাতঃ দৃষ্টিতে ভালো, মহৎ মনে হচ্ছে। ঠিক এভাবেই সে একজন গায়রে মাহরামকে, আরেকজন গায়রে মাহরামের কাছ অবধি পৌঁছিয়েছে। এরপর যা হবার তাই হলো।

আজকাল ফ্রি মিক্সিং তো আছেই। তথাপি, আমরা যারা একটু দ্বীন মেনে চলার চেষ্টা করি, যারাই পর্দা, হিজাব, নিক্বাব করে চলে, তারাও এরকম ধোঁকায় পড়ে যাই। ফেইসবুক এক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা পালন করে। ফেইসবুকে চ্যাটালাপে, ইনবক্সে প্রয়োজনের বাইরে কথা বলা, গায়রে মাহরামের সাথে একান্ত বিষয় শেয়ার করে বসা, তার খোঁজ নেওয়া ইত্যাদি আমাদের একে-অন্যের প্রতি দূর্বল করে তুলতে পারে। এটা অবশ্যই ফেৎনা।

তাই আমাদের চেষ্টা করা উচিত গায়রে মাহরামদের সাথে প্রয়োজনের বাইরে কথা (ইনবক্সে) না বলা। তাদের কমেন্টে ( প্রয়োজন না হলে ) রিপ্লে না দেওয়া। আমাদের উচিত কোন গায়রে মাহরাম আমাদের এক্সট্রা কেয়ার (যেমন- ২-১ দিন পর পর কেমন আছেন, দিনকাল কেমন যাচ্ছে ইত্যাদি টাইপ) নিলে তাতে আগ্রহ না দেখানো। আমরা আল্লাহর কাছে বিতাড়িত শয়তান থেকে পানাহ চাই। বি. দ্র. ঘটনাটি বেলা ফুরাবার আগে বইয়ের আমরা তো স্রেফ বন্ধু কেবল অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে।

Design & Developed by ProjanmoIT