আজ মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ইং | ২ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

দ্বীন-ধর্ম ও ব্যবসা প্রসঙ্গ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিতঃ ১৭ মে ২০১৯ সময়ঃ রাত ৩ঃ০০
দ্বীন-ধর্ম ও ব্যবসা প্রসঙ্গ

ধর্মীয় বিষয়গুলো মানুষ মুফতে পেতে চায়। দুনিয়ার মধ্যে সবচে ভ্যালুলেস জিনিস মনে করে ধর্মীয় জিনিসকে। উপরে উপরে না বললেও কাজেকর্মে ও কখনোসখনো কথাবার্তায় তা-ই বুঝিয়ে দেয়। যে কোন জিনিস ধর্মের সাথে কোন না কোন ভাবে সংশ্লিষ্ট হলেই সেটা মাগনা হতে হবে- এমন ধারণা নিজেদের ভেতর পোষণ করেন অনেকে।

 

ছেলেকে প্রাইভেট পড়ান কাশেম সাহেব। মাস্টার সাহেবকে তিনি দেন তিনচার হাজার টাকা। মাস্টার সাহেবের পরেই আসেন হুজুর সাহেব। ধর্মকর্ম শিক্ষা দেন ছেলেকে। তাকে তিনি দেন মাসে এক এক হাজার টাকা। তবুও মাস শেষে নোটটা বের করার সময় ভেতরটা খচখচ করতে থাকে। ভাবেন, বেশি দিয়ে ফেলছি না তো? পাঁচশো দিলেও তো হতো মনে হয়। এই ধরনের কাশেম সাহেবরা আজ চারদিকে গিজগিজ করে।

 

প্রকাশনী ধর্মীয় বই বের করে। পান থেকে চুন খসলেই এক ধরনের পাঠক ঠাস করে বলে দেয়- ‘আরে এসব বইটই সব হলো ব্যবসার ধান্ধা!’ এমনভাবে বলে যেন ব্যবসা দুনিয়ার নিকৃষ্টতম একটি বস্তু। খুবই খারাপ জিনিস। এটা করা পাপ। এরা ভাবে, এটা ধর্মীয় জিনিস যেহেতু, সেখানে আবার ব্যবসা হবে কেন? সবই মুফতে হওয়া চাই। অথচ ব্যবসা ধর্মেরই একটা অঙ্গ। ধর্মবহির্ভূত কিছু না। হালাল রুজি উপার্জন করতে ব্যবসাকে ইসলাম উৎসাহ দেয়। ব্যবসার পথ-পদ্ধতি বাতলে দেয়। তবে শর্ত করে দেয়, সেখানে যাতে ধোঁকা না থাকে। ঠগবাজি আর বাটপারি না থাকে। যথাযথ পদ্ধতিতে কাঙ্খিত সেবা প্রদান করে মুনাফা অর্জন করলে এটা নিন্দিত তো নয়ই, বরং নন্দিত।

 

আরেক শ্রেণির পাবলিক আছে, যারা নিজেরা হয়তো মুনাফা গ্রহণ ছাড়াই কোন সেবামূলক কাজ করলো। এর দ্বারা নিজেকে হাতিম তাঈর সহোদর ভাবতে শুরু করে। নিজের এই বিনিময়হীন সেবাপ্রদানের গর্বে তার বুক ফুলে তিন ইঞ্চি বেড়ে যায়। সেই ফুলে উঠা ফাঁপা জায়গায় জমা হয় গর্ববোধ। তখন অন্য যারা বিনিময় নিয়ে যথাযথ সেবাপ্রদান করছে তাদের নাক সিঁটকাতে থাকে। নিজের বিনিময়হীন কাজকে অতি মহান ভাবতে থাকে আর অন্যদের বিনিময় নিয়ে সেবাপ্রদানকে খাটো চোখে দেখতে থাকে। যদিও তাদের সেই সেবাপ্রদান যতোই যথাযথ হোক না কেন। এমন মনোভাবের ভেতর দিয়ে এমন মনোভাবের লোকজন তাদের বিনিময়হীন কাজের দরুন অর্জিত অতিরিক্ত নেকিকেই বারবাদ করে দেয় মূলত। বিনিময়হীন সেবাপ্রদানের দরুন তাদের যে একটা ফজিলত ছিলো সেটা নিজের হাতে গলাটিপে হত্যা করে।

 

কোথাও পড়েছিলাম, থানবী রাহিমাহুল্লাহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বেতন না নেওয়া শিক্ষক নিয়োগ পছন্দ করতেন না। কারণ বেতন না নেবার দরুন দেখা যায় শিক্ষকের ভেতর সেই সিরিয়াসনেসটা থাকে না, যেটা বেতনভুক্তদের মধ্যে থাকে। এমন শিক্ষকরা অনেক সময় আইনের পাবন্দ হয় না। নিয়মের বাহিরে মনে চাইলেই এটা-ওটা করে বসে থাকেন। কিন্তু যেহেতু তিনি বেতনভুক্ত নন তাই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তাকে ওভাবে কিছু বলাও যায় না। আমি নিজে এর বাস্তবতা দেখেছি। আমার একজন শিক্ষক ছিলেন, যিনি মাদরাসা থেকে বেতন নিতেন না। তো লীগ সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনের আগে যখন রাস্তাঘাটে হরতাল-অবরোধ চলতো তিনি আসতেন না। ফলে বছর শেষে উনার যিম্মায় থাকা সিলেবাস শেষ হয় নি। মাদরাসা কর্তৃপক্ষও চাপ দিয়ে কিছু বলতে পারে নি তাকে। এটা কেন হলো? কারণ তিনি বেতনভুক্ত ছিলেন না। মাগনা পড়াতেন। যিনি মাগনা পড়ান তিনি তো কৈফিয়তের বাহিরে থাকেন। এটাই সাধারণ চিত্র।

 

ধরেন আমি একজনকে মাগনা পড়াই। তখন সেখানে আমার দায় থাকে না কোন। মন চাইলে বলে দিতে পারি, আজকে পড়াবো না। আমার মন ভালো নাই। কিন্তু যখন আমি তার থেকে পারিশ্রমিক নিয়ে পড়াবো তখন দেখা যাবে আমার উপর একটা দায় থাকে। শতো সমস্যাকে মাথায় রেখেও পড়ানোটা আমাকে চালিয়ে নিতে হয়। যেহেতু দায়বদ্ধতার ব্যাপার আছে এখানে। আবার যিনি পড়ছেন তার ভেতরেও একটা সিরিয়াসনেস থাকে। যেহেতু তিনি অর্থ ব্যয় করছেন পড়ার জন্য। ফ্রি সেবাগুলো তাই অনেকসময়ই কম ফায়দাজনক হয়। অভিজ্ঞতা থেকেই বললাম কথাটা। তবে যিনি ফ্রি পড়াবেন তিনি অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। কারণ যাদের পারিশ্রমিক দিয়ে পড়তে অসুবিধা থাকে তারা এর মাধ্যমে উপকৃত হয়ে থাকে।

 

মনে করেন, আজকে আমি একটা প্রকাশনী খুললাম। উদ্দেশ্য হলো মাগনা বই বিতরণ করবো বা উৎপাদন খরচের মূল্যেই বই বিক্রি করবো। কোন টাকাই লাভ করবো না। পুরোটাই ফীসাবিলিল্লাহ করবো। কারণ আমার বাপের অঢেল টাকা-পয়সা আছে। বই-ব্যবসা করে মুনাফা লাভের আমার দরকার নাই। সংসার নিয়া আমাকে ভাবতে হয় না। মায়ের ঔষুধের যোগাড় কোত্থেকে হবে, বোনের বা ছেলেমেয়ের পড়াশোনার ব্যয়টা কোনখান থেকে আসবে এসব নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। বাপের ফ্ল্যাটেই থাকি। বাসাভাড়া নিয়েও ভাবনা নাই। এখন আমি প্রকাশনী খোলার পর যখন দেখলাম অন্যরা তো বই প্রতি দশ টাকা করে মুনাফা অর্জন করছে তখন আমি এটাকে তাচ্ছিল্যের চোখে দেখলাম। নিজের মাগনা-প্রকল্পের চশমা চোখে থাকায় অন্যদের বই-ব্যবসাকে দ্বীন বেঁচে খাওয়া বলে অভিহিত করলাম। তাদের ইখলাস নিয়া প্রশ্ন তুললাম। এটা কি আদৌ সমর্থনযোগ্য? শরীয়তের কথায় পরে আসি, বিবেকও কি এটাতে সায় দেয়? হ্যা, দিতে পারে সেই বিবেক, যেই বিবেক ঝং ধরার ফলে তার স্বাভাবিকতা হারিয়েছে।

 

হ্যা, আপনি সেই ব্যবসা নিয়ে আপত্তি করতে পারেন যেটা ঠগবাজি আর প্রতারণার উপর দাঁড়িয়ে আছে। গ্রাহককে ঠকানো আর বোকা বানানোর মিশনে নেমেছে। এটা তো ধর্মীয়-অধর্মীয় সকল ব্যাপারেই সমভাবে প্রযোজ্য কথা। গোশত বিক্রেতা গরুর গোশতের কথা বলে আমাকে মহিষের গোশত গছিয়ে দিলে যেমন আমি নিন্দা করবো তেমনি ধর্মীয় কোন জিনিস নিয়ে কেউ এমন প্রতারণা করলে সেখানেও নিন্দা করবো। প্রতারণা তো সর্বক্ষেত্রেই নিন্দা করার জিনিস। এখানে ধর্মীয় বিষয়কে আদালাভাবে মেনশন করার যৌক্তিকতা তেমন দেখি না। সর্বোচ্চ লঘু-গুরুর কথা হয়তো বলতে পারেন। কিন্তু সেটা তো ভিন্ন প্রসঙ্গ। মূল অপরাধ হিসেবে দুটোই প্রতারণা।

Design & Developed by ProjanmoIT