আজ রবিবার, ৭ জুন ২০২০ ইং | ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

জিডিপি (এউচ) কখনোই টেকসই উন্নয়নের মাপকাঠি হতে পারে না

আ.ন.ম.মাছুম বিল্লাহ ভূঞা
প্রকাশিতঃ ৭ মে ২০১৯ সময়ঃ সন্ধ্যা ৬ঃ০০
জিডিপি (এউচ) কখনোই টেকসই উন্নয়নের মাপকাঠি হতে পারে না

বিশ্বের অভিধান থেকে উন্নয়ন শব্দটি উঠে গেছে। সকল অবকাঠামো তৈরিই উন্নয়ন নয়। এখন বলা হচ্ছে টেকসই উন্নয়ন। উন্নয়ন সম্পর্কে একেকজনের বোধ একেক রকম। আমাদের কিছু অর্জন আছে সত্য। কিন্তু সেই অর্জন কতটা টেকসই হয়েছে, সে ব্যাপারে অনেকেরই প্রশ্ন আছে। পরিবেশ ও উন্নয়ন মোটেও সাংঘর্ষিক নয়, যদি টেকসই উন্নয়নের নীতিগুলো মেনে চলা হয়। উন্নয়ন পরিকল্পনার ক্ষেত্রে জনগনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, উন্নয়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে জনগণের তথ্য পাওয়া নিশ্চিত করতে হবে। 

অর্থনৈতিক সূচকের দিক থেকে আমরা অনেক এগিয়েছি। পরিসংখ্যান ব্যুরো তথ্য মতে, বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়ে হয়েছে ১৯০৯ ডলার। চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে ৮.১৩ শতাংশ- এ তথ্যও একই সূত্রে পাওয়া। বহু বছর পূর্বে ৮ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন ¯^প্ন ছিল। এখন সেটা মনে হয় না। কিন্তু সমস্যা হলো, জিডিপি (এউচ) কখনোই উন্নয়নের মাপকাঠি হতে পারে না। পারে কি??

উদাহরণ হিসাবে বলা যায়: মনে করুন আমার বস্ মাসে যথাক্রমে ০১ কোটি টাকা ও আমি ৫০০ টাকা আয় করি। আয়ের দুই ব্যক্তির গড় আয় ৫০ লাখ ২৫০ টাকা। স্কুলে যেমন একজনের পরিক্ষার প্রাপ্ত নম্বর আরেকজনকে দেওয়া যায় না, তেমনি একের আয়ও অপরকে দেওয়া যায় না। বাস্তবে এ গড়ের বা জিডিপি (এউচ) কোনো মূল্যই নেই। 

এই জন্যই কিন্তু এ উন্নয়নকে টেকসই মনে করতে পারছি না। কারণ বন ভূমির পরিমাণ আগের চেয়ে ১০ শতাংশ কমে এসেছে। ওয়াসার পানির পানের অযোগ্য। ঢাকা শহরবাসীর ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত কোনো নদীর পানি সরবরাহ ব্যবস্তা না থাকলেও অনেক ব্যক্তি মালিকানধীন কোম্পানী পানি পান বিনা মূল্যে। নেই কোন ভাল পানি শোধনের উপায়। আবার ঢাকা শহরের ব্যক্তিগত গাড়ি নির্ভরতার ফলে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগে। বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ বেড়ে গেছে কয়েকশত গুন।

প্রশাসনকে বিকেন্দ্রিকরন করে এবং বহুতল ভবন করে বসবাসের জন্য ঢাকা শহরের অর্ধেকেই হয়তো যথেষ্ট ছিল। অনেক সবুজ গাছপালা, জলাশয় আমরা বাঁচাতে পারতাম, কিন্তু সেটি আমরা করিনি। যার কারণে ঢাকা নগরীকে বলা হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ নগরী এবং নগরীতে আমরা বসবাস করছি। অনেক ইটভাটা হচ্ছে। তার দূষণ  থেকে মানুষকে বাঁচানো যাচ্ছে না। বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশ ইটভাটা থেকে সরে আসছে বায়ু ও মাটি দূষণের কারণে। আমরা বেশি করে ইট তৈরি করছি, উন্নয়ন হলে নাকি অধিক ইট লাগবে। অথচ আমরা বিকল্প ইটের দিকে যাচ্ছি না। উন্নয়নের জন্য যে প্রযুক্তিকে বেছে নিলে প্রাণ-প্রকৃতি বাঁচাতে পারতাম, সেটি করা হচ্ছে না।

পরিবেশ ধ্বংসকারী উন্নয়ন কখনো টেকসই হয় না। পরিবেশকে টিকিয়ে রেখে উন্নয়ন করলে হয়তো আমাদের জিডিপি তুলনামূলক কম হতো। কিন্তু সেটি টেকসই হতো এবং দীর্ঘমেয়াদে দ্রুত এগিয়ে যেতে পারতাম। তাছাড়া জিডিপি কখনোই উন্নয়নের মাপকাঠি হতে পারে না। বিশ্বব্যাংকের সা¤প্রতিক প্রতিবেদন দেখলেই বোঝা যাবে, আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পিত হয়নি। দেশের অন্য জায়গাগুলোকে বাঁচানো পাশাপাশি ঢাকা শহরকে কীভাবে বাঁচানো যাবে, সে সম্পর্কে আসলে কোনো বাস্তবিক পরিকল্পনা হচ্ছে না। একটি বড় জনবহুল শহরকে বাঁচাতে হলে এর আশপাশের জায়গাগুলোকে বাঁচাতে হয়।

ভারতের ন্যাশনাল গ্রিণ ট্রাইব্যুনাল দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিদেশী বিনিয়োগের উন্নয়ন প্রকল্প খারিজ করে দিয়েছে। তাতে কি দেশটির উন্নয়ন থেমে আছে? তা তো নেই। কাজেই উন্নয়ন ও পরিবেশকে তারাই আসলে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়, যারা উন্নয়নের নামে নিজের পকেট ভারী করে। যে উন্নয়ন একটি ছোট গোষ্ঠীকে বড়লোক করে অধিকাংশ মানুষকে সম্পদহারা করে, সেটি টেকসই উন্নয়নের সংজ্ঞায় পড়ে না।

আমরা প্রাকৃতিক সম্পদ সৃষ্টি করতে পারব না। আর যা নিজেরা সৃষ্টি করতে পারব না, তা ধ্বংসে আমাদের আইনি বা নৈতিক অধিকার নেই। সরকারকে এ কথাটি গুরুত্ব দিয়ে আইন প্রয়োগ করতে হবে। তবে নিজ¯^ ধারায় উন্নয়ন হবে, সবার (জনগণের) মতামতের ভিত্তিতে উন্নয়ন হবে; কোনোভাবেই আরোপিত উন্নয়ন হবে না। যদি দেখা যায় উন্নয়ন পরিবেশ বিধ্বংসী হচ্ছে, তাহলে জনগণকে প্রতিকার পাওয়ার বিধান করে দিতে হবে। এই জন্যই জনগনের অংশগ্রহণমূলক পরিবেশবান্ধব টেকসই উন্নয়ন দরকার।

 আ.ন.ম.মাছুম বিল্লাহ ভূঞা,আইনজীবি

Design & Developed by ProjanmoIT