আজ বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২০ ইং | ১৬ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

আজ শহীদ আহ্সানউল্লাহ্ মাস্টারের ১৬ তম শাহাদাৎ বার্ষিকী

সামসুল হক
প্রকাশিতঃ ৭ মে ২০২০ সময়ঃ সকাল ১০ঃ০০
আজ শহীদ আহ্সানউল্লাহ্ মাস্টারের ১৬ তম শাহাদাৎ বার্ষিকী

রাজনৈতিক আদর্শ ও সততার প্রতীক, গাজীপুরের প্রাণ পুরুষ, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের নিবেদিত প্রাণ, সর্বজন শ্রদ্ধেয়, জাতীয় ব্যক্তিত্ব, শহীদ আহসান উল্লাহ্ মাস্টার ২০০৪ সালের ৭ মে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বি এন পির শাসনামলে সন্ত্রাসীদের নির্মম গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহাদাত বরন করেন। 

 

তিনি একদিকে ছিলেন মানুষ গড়ার কারিগর, একজন আদর্শ শিক্ষক অন্য দিকে ছিলেন সন্ত্রাস মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাবাপন্ন, ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাজপথের লড়াকো সৈনিক। নিজস্ব যোগ্যতায় তৃনমূল থেকে উঠে আসা অধিকার সচেতন, জনপ্রিয়, রাজীতিবিদ শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার ছিলেন ঐ সময়ের গাজীপুর-২ আসনের আওয়ামী লীগ থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় শ্রমিক লীগের কার্যকরী সভাপতি। অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকায় ক্ষমতালোভী কুচক্রীর হাতে তাঁকে এই নির্মমতার শিকার হতে হলো।

 

মৃত্যঞ্জয়ী ভাওয়াল বীরের জন্ম ১৯৫০ সালের ৯ নভেম্বর, তৎকালীন ঢাকা পরবর্তিতে গাজীপুর জেলার পুবাইল ইউনিয়নের হায়দরাবাদ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। বাবা আলহাজ্ব আব্দুল কাদির ছিলেন এলাকায় সুপরিচিত একজন প্রকৃত ধর্মপ্রাণ শিক্ষানুরাগী আর দাদা আদম আলী মুন্সী ছিলেন সকলের শ্রদ্ধাভাজন সজ্জন ব্যক্তিত্ব এবং মা রুসমুতেরনেছা ছিলেন একজন ধার্মিক, পরোপকারী আদর্শ গৃহিনী। শহীদ মাস্টারের রাজনৈতিক সাফল্যের পেছনে যার ত্যাগ আর অনুপ্রেরণা সবচেয়ে বেশী তিনি হলেন তাঁর সহধর্মিনী জনাবা ফরিদা আহসান। দুই পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের (জনাব জাহিদ আহসান রাসেল, বর্তমান সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী এবং চারবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য, জাবিদ আহসান সোহেল ও শাহনাজ জাহান পপি) স্বার্থক জননী সুসন্তান হিসাবে গড়ে তুলেছেন পিতার আদর্শে।

 

প্রখর মেধাসম্পন্ন বরেণ্য এই শিক্ষকের শিক্ষাজীবন শুরু হয় নিজ গ্রাম হায়দারাবাদ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে টঙ্গী হাইস্কুল থেকে ১৯৬৫ সালে কৃতিত্বের সাথে এস এস সি পাশ করেন তিনি। তৎকালীন কায়েদে আযম কলেজ বর্তমান শহীদ সোহরাওয়ার্দী সরকারি কলেজ থেকে ১৯৭০ সালে ডিগ্রি পাস করার পর তিনি টঙ্গীর নোয়াগাঁও এম এ মজিদ মিয়া হাইস্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি ঐ স্কুলেই সহকারী প্রধান শিক্ষক ও পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন এবং আমৃত্যু প্রধান শিক্ষক পদে আসীন ছিলেন।

 

আপোষহীন এই নেতা জেলার শিক্ষক সমিতির সভাপতি হিসেবে শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি আদায়ে সর্বদা সোচ্চার ছিলেন এবং তাঁর মেধা ও বলিষ্ঠ ব্যাক্তিত্বের কারনে শিক্ষকদের প্রিয় ও শ্রদ্ধাভাজন হয়ে ওঠেন।

 

উচ্চ মাধ্যমিকে অধ্যয়নরত অবস্হায় ১৯৬২ সালে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগে যুক্ত হয়ে ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতিতে হাতেখড়ি তাঁর। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুঘোষিত বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা, ১৯৬৯ সালে ১১ দফার আন্দোলনে তিনি ছিলেন রাজপথের লড়াকো সৈনিক। ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ জয়দেবপুরের ক্যান্টনমেন্টের বাঙালী সৈন্যদের নিরস্ত্র করতে ঢাকা থেকে আসা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম সশস্র প্রতিরোধ যুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তিনি।

 

১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর আহবানে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার প্রাক্কালে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আটক ও নির্যাতিত হন স্বাধীনচেতা এই নবীণ শিক্ষক। সৌভাগ্যক্রমে ছাড়া পেয়ে আহত অবস্হায় ভারত চলে যান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনের জন্য। ট্রেনিং শেষে ভারত থেকে ফিরে এসে পুবাইল, টঙ্গী, ছয়দানাসহ এলাকার বিভিন্ন জায়গায় গেরিলা যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।

 

১৯৮৩ সালের পুবাইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর জনপ্রতিনিধিত্ব শুরু। তাঁর সততা, নিষ্ঠা, নীতি ও আদর্শের কারনে তিনি ১৯৮৮ সালে বিপুল জনপ্রিয়তায় পুনরায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তাঁর সুখ্যাতি ও জনপ্রিয়তায় ১৯৯০ সালে আওয়ামীলীগের মনোনয়নে গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। বহুমাত্রিক এই রাজনীতিক ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে বিপুল ভোটে গাজীপুর থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন জাতীয় শ্রমিক লীগের কার্যকরী সভাপতি।

 

নির্লোভ, ব্যতিক্রমী এই নেতা ছিলেন গণমানুষের কল্যাণে একজন নিবেদিত প্রাণ। এলাকাকে মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত রাখতে যখন তিনি জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলেন। বিপুল ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্য থাকাকালে কুচক্রীরা তাঁর ওপর চূড়ান্ত আঘাত হানে।

অসুস্থ রাজনীতির বাইরে থাকা গাজীপুরবাসীর মধ্যমণি প্রাণপ্রিয় এই নেতার হত্যাকাণ্ডের খবর শুনে গাজীপুরসহ সারা দেশের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে।

 

আহসানউল্লাহ্ মাস্টারকে হত্যা করা হয়েছ কিন্ত হত্যা করতে পারেনি তাঁর আদর্শকে। তাঁরই আদর্শ ধারণ করে তাঁরই উত্তরসৃরী, সুযোগ্য সন্তান গাজীপুরের অহংকার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত স্নেহভাজন জনাব জাহিদ আহসান রাসেল দায়িত্ব পেয়েছেন বর্তমান সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রীর এর আগে নির্বাচিত হয়েছেন টানা ৪ বার সংসদ সদস্য।

 

শিক্ষকতার পাশাপাশি জনকল্যানে নিবেদিত এই মানুষটি ছিলেন পরীক্ষিত দেশপ্রেমিক গণমানুষের কাছাকাছি একজন উদার, পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ, গরীব দুঃখী শ্রমজীবী মানুষের নেতা। মনে প্রাণে আওয়ামীলীগের অনুসারী হলেও তিনি ছিলেন দলমতনির্বিশেষে এলাকার সকল শ্রেণী- পেশার মানুষের ভালোবাসা ও আস্থারস্হল।

 

রাজনীতির পেশী ও অর্থশক্তির উর্ধ্বে ধর্মভীরু ব্যতিক্রমী এই রাজনীতিবিদের নীতি ও আদর্শ আজ সর্বজন স্বীকৃত ও অনুকরণীয়। তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ হোক আমাদের চলার পথের পাথেয় ও অনুপ্রেরণা -- শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টারের মৃত্যুবার্ষিকীতে এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।

 

মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন তাঁকে জান্নাতবাসী করুন ।

Design & Developed by ProjanmoIT